নিম্ন আদালতের মামলার জট নিরসন ও দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কিনা? আইনমন্ত্রীকে ফুলবাড়ীয়ার এমপি

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ফুলবাড়ীয়া আসনের এমপি অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে জানতে চান, নিম্ন আদালতের মা’মলাগুলি অত্যন্ত ধীরগতিতে পরিচালিত হয়। এতে বাদী ও বিবাদী উভয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিম্ন আদালতের মা’মলার জট নিরসন ও দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কিনা?
জবাবে, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে সরকার নিম্নলিখিত স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
The Code of Civil Procedure, 1908-এ যুগোপযোগী সংশোধন আনার জন্য ইতোমধ্যেই এই সংসদের প্রথম অধিবেশনে The Code of Civil Procedure (Amendment) Act, 2026 পাস হয়েছে। উক্ত আইনে এসএমএস ও ভয়েস কলের মাধ্যমে সমন জারী করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল করা এবং সরাসরি জেরা করার বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। এছাড়াও, ডিক্রি জারির জন্য পৃথক মোকদ্দমা না করে মূল মোকদ্দমায় সরাসরি জারী দরখাস্ত দাখিলের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।
ফৌজদারী মামলার দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই এই সংসদের প্রথম অধিবেশনে The Code of Criminal Procedure (Amendment) Act, 2026 পাস হয়েছে। উক্ত আইনে মামলার কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমানোর জন্য পলাতক আসামীর ক্ষেত্রে Proclamation and Attachment প্রক্রিয়া পরিহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সমন জারিতে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে অধিকতর দ্রুত। জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে সরকার এই সংসদের প্রথম অধিবেশনে নারী ও শি নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাস করেছে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন গতিশীল করার জন্য বাণিজ্যিক বিরোধসমূ দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে সরকার এই সংসদের প্রথম অধিবেশে বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ পাস করেছে।
তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০-এর বিধানমোতাবেক মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চিকিৎসক এবং আসামির দোষস্বীকারোক্তি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য অনলাইে গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে সাক্ষীদের সশরীরে আদালতে উপস্থিত না হয়েও সাক্ষ্য দেওয়া সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। এছাড়া, মামলার আসামীদের নির্ধারিত তারিখ আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার কারণে আসামীদে হাজির না করে কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য The Code of Criminal Procedure, 1898 সংশোধনের কাজ চলছে।
ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্যের পাশাপাশি পুলিশের তদন্ত তদারকি, জামিন শুনানি, রিমান্ড শুনানি ও এভিডেভিট সম্পাদনসহ নানাবিধ কাজ করতেন বিধায় বিচারকার্যে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হতো না। এই সমস্যা সমাধানে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য পৃথক বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ফলে ম্যাজিস্ট্রেটগণের মামলা নিষ্পত্তিতে অধিকতর সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এছাড়া, বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃজন করা হয়েছে; পাশাপাশি নতুন করে ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগসহ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আদালতের সহায়ক কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাসহ সারাদেশে আলোচিত মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটরের সভাপতিত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যই অত্র সংসদের প্রথম অধিবেশনে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাস হয়েছে। উক্ত আইনের তফসিলভুক্ত ৯টি আইনের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং The Negotiable Instruments Act, 1881 ব্যতীত অবশিষ্ট ৭টি আইনের আওতায় উদ্ভুত বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের পূর্বে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার উদ্যোগ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মধ্যস্থতায় সমঝোতা হলে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার কর্তৃক প্রত্যয়িত চুক্তি আদালতের রায়ের সমান কার্যকর হবে। বর্তমানে ২০টি জেলায় লিগ্যাল এইডের এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে বিরোধ নিষ্পত্তির হার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মামলা দায়েরের হার দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া, আইনগত সহায়তা সেবা শক্তিশালীকরণে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, অনলাইনে সেবা প্রদান, প্রবাসীদের আইনগত সহায়তা প্রদান, বিশেষ মধ্যস্থতাকারী নিয়োগসহ বিনামূল্যে আইনি সহায়তার জন্য ১৬৬৯৯ হটলাইন চালু করা হয়েছে।
সারাদেশে বিদ্যমান এজলাস সংকট নিরসনের লক্ষ্যে ২৩টি জেলায় চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণসহ ৪টি জেলায় চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রেরিত খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব-এর বিষয়ে গত ১০/০৬/২০২৬ তারিখে পরিকল্পনা কমিশন পিইসি সভা করেছে। এছাড়া, সারা দেশের ৩৯টি চৌকি আদালত ভবন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকগণের জন্য আবাসন নির্মাণ সংক্রান্ত খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণের আলোকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
বর্তমানে ১৬টি জেলায় ই-বেইলবন্ড ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালু রয়েছে। অনলাইনে বেইলবন্ড দাখিল করার মাধ্যমে আইনজীবী, কারা প্রশাসন ও বিচারপ্রার্থী সকলের অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। উক্ত কার্যক্রম সফল হওয়ায় সরকার সফটওয়্যারটি পর্যায়ক্রমে সকল জেলায় চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।